করোনায় কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ, ফরিদগঞ্জে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন ১২শ’ শিক্ষক কর্মচারি

মামুন হোসাইন: ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রায় ৮০ টি কিন্ডারগার্টেন। গত বছর ১৭ মার্চ থেকে কোভিড ১৯ করোনা কারণে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা উক্ত কিন্ডারগার্টেন গুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১২শ’ শিক্ষক কর্মচারি সম্পূন্ন ভাবে বেকার হয়ে পড়ে। আর এই বেকারত্বের কারনে ওই সমস্ত শিক্ষক ও তাদের পরিবারের ছেলে-মেয়েরা অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। গত প্রায় দেড়টি বছরে ওই পরিবার গুলোর পাশ্বে সরকারসহ সমাজের বিত্তবান, কেউই তাদের দিকে তাকিয়ে দেখার সময় হয়নি। ফলে ১২ শ’ শিক্ষক ও কর্মচারী এবং তাদের সন্তান ও পরিবার গুলো এক কঠিন মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের পরিবারের মাঝে এই বারের ঈদের আনন্দ কেটেছে অনাহার আর অর্ধহারে।


এদিকে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকরা অর্থ অভাবে তাদের অধিনে কর্মরত শিক্ষকদের মাসিক বেতন ভাতা দিতে না পারায় বহু শিক্ষক এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠান খুলবে এই আশায় বসে আছে। বেশীর ভাগ শিক্ষক বেকার হয়ে যাওয়ায় তারা চোখে মুখে অন্ধাকার দেখছে। বর্তমানে তারা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে কঠিন দিন কাটাচ্ছে।
যার বাস্তব চিত্র, ফরিদগঞ্জ সদরে অবস্থিত বর্ণমালা কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম ,উপজেলা শহরে বাসাভাড়া করে থাকতেন তিনি। টিউশনি, কোচিং আর প্রাইভেট পড়িয়ে কোনো রকম সংসার চালাতেন। করোনার করালগ্রাসে মধ্য মার্চ থেকে তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোনো বেতন পাচ্ছেন না। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, সংসার খরচ ও দুই সন্তান ও অসুস্থ্য স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই থাকেন। একই সাথে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খাবার এবং ওষুধ খরচ তিনি দিতে পারছেন না। তিনি জানান, গত দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা কোন বেতন পাই না। আমরা অনলাইন ক্লাস ও বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়া লেখামূখী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অভিভাবদের কাছ থেকে তেমন কোন সাড়া পাই না। অভিভাবকরা বেতন বন্ধ করে দিয়েছে। যার কারণে মালিক পক্ষ বিপাকে আছে।
অপর এক শিক্ষক ইয়াকুব হোসেন সাপ্তাহিক আলোকিতকে একজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের আয় বন্ধ। তাই আমাদের বেতনও নেই। ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের কারণে এখন টিউশনি-প্রাইভেট বা কোচিংয়ে অভিভাবকরা ছাত্রছাত্রী পড়াতে চাচ্ছে না।
কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক তার তাদের দূর অবস্থান কথা বলতে গিয়ে বলেন রোজার ঈদে তারা রীতিমতো পরিবার থেকে পালিয়ে ছিলেন। কাররণ তারা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের নতুন জামা-কাপড় সংস্থান দূরের কথা, খাবারের ব্যবস্থাও করতে পার ছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা বা ঋৃণ করে সংসার টেনেটুনে চালিয়ে নিচ্ছেন তারা।
ফরিদগঞ্জ ইকরা মডেল একাডেমী এন্ড মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক বলেন, দেশের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের আয় খুব কম। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষক-কর্মচারীদের নামেমাত্র বেতন-ভাতা পায়। কিন্তু করোনা আসার পর সেই উপার্জনও কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন সেই সামান্য বেতন-ভাতাও দিতে পাচ্ছি না। শিক্ষকরা টিউশনি-কোচিং বা ছোটখাটো ব্যবসা করে চললেও সেই বিকল্প আয়ও কেড়ে নিয়েছে করোনা। তিনি বলেন, সরকার শিক্ষকদের ৫ হাজার আর কর্মচারীদের আড়াই হাজার টাকা করে এককালীন প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা প্রতি মাসে সহায়তা করলেও শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটত।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন ফরিদগঞ্জ শাখার সভাপতি ও মাতৃছায়া কিন্ডারগার্টেনের প্রতিষ্ঠিাতা রেজাউল করিম মাসুদ বলেন, ফরিদগঞ্জের প্রতিষ্ঠানগুলো সবই ভাড়া বাড়িতে চলে। ওই ভাড়া এবং শিক্ষকদের বেতন আসে টিউশন ফি থেকে। গতবছর মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করতে পারচ্ছে না। চলতে বছরে ও একেই অবস্থা হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দেয়া দূরের কথা, বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচ চালাতে পারছেন না। এ অবস্থায় অনেকে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছেন। আবার অনেকে বিক্রির নোটিশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা সরকারের কাছে ৫শত কোটি টাকা প্রণোদনা চেয়েছি। এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *