টিউশনির তেরো বছর পূর্ণ, বেতনের জন্যও কাঁদতে হয়েছে অনেক

রাসেল ইব্রাহিম:
২০০৮ সাল। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণীতে উঠলাম। কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছেলেদের মধ্যে রোল নম্বর ৯ থেকে ৩ হলো। ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন পরিচয় পেলাম। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন সময়ে এক বন্ধুর কাছে বললাম, ইশ্, যদি দু’একটা টিউশনি পেতাম তাহলে অল্প টাকা দিয়েই পড়াতাম। বাবা কৃষি কাজ করতেন, তাই টিউশনির চিন্তা মাথায় এলো। সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে আমার চাচি খবর দিলেন এবং চাচাতো ভাই আরমান হোসেনকে(প্রথম শ্রেণি) প্রাইভেট পড়াতে বললেন। মনেমনে খুব খুশি হলাম এবং ৬ তারিখে টিউশনি শুরু করলাম। বেতন ১৫০ টাকা। পরের দিন তার সাথে আরেকটা স্টুডেন্ট পেলাম,বেতন ১৫০ টাকা। তাছাড়া ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর দুটি( দ্বিতীয় ও শিশু শ্রেণির) স্টুডেন্ট পেলাম। একজনের বেতন ১০০ টাকা এবং আরেকজনের বেতন ১৫০ টাকা। শিক্ষার্থীর নাম, তারিখ এবং টাকার অ্যামাউন্ট ডাইরিতে লিখে রাখতাম প্রথম প্রথম, আর কয়েক মাস পরপর কত টাকা ইনকাম করেছি তা হিসাব করতাম। ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টিউশনি করে ৫১+ হাজার টাকা পেয়েছি। পরে আর হিসাব রাখিনি। এভাবেই শুরু হলো টিউশনি, যা আজও চলছে, আলহামদুলিল্লাহ।

তবে টিউশনি করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। টিউশনি করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে প্রব্লেমেও পড়েছি। একই শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং একই বাড়িতে চারজন ছিল। আমি দু’জনকে পড়াতাম। অন্য দু’জনকে পড়াতো ডিগ্রির ছাত্র। ডিগ্রির ছাত্র তাঁর দু’জন শিক্ষার্থীকে বলত, রাসেল সেভেনে পড়ে, আমিই ত তাকে পড়াতে পারি। পরে ঐ দু’জন শিক্ষার্থী আমার দু’জন শিক্ষার্থীর কাছে বলত এবং তা আমার কানে আসতো। খুব খারাপ লাগতো।তিনি টিউশনি জগতে টিকে থাকতে পারেননি, আমি টিকে আছি।

একদিন ত দু’জন শিক্ষার্থীর সাথে ক্রিকেট খেলার সময় একটা স্মরণীয় ঘটনা ঘটে গেল। আমার ব্যাটিং শেষে বললাম, চল্ ,এখন পড়ার টাইম, তোরা পরে ব্যাটিং করিছ।একজন শিক্ষার্থী আমার লুঙ্গি টেনে ধরল এবং বলল, বলিং করে যেতে হবে এবং খেলা দিয়ে যেতে হবে । আমি ত অবাক হয়ে গেলাম। তখন থেকেই শিক্ষার্থীদের সাথে খেলাধুলা ছেড়ে দিয়েছি।

টিউশনির টাকা পেয়ে কান্নাকাটি পর্যন্ত করেছি। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থীর মা অসচেতন হওয়ায় নিজের অনিচ্ছায় এবং শিক্ষার্থীর বাবার( ভালো টাকার মালিক) রিকুয়েস্টে দু’জন শিক্ষার্থী পড়ালাম। ঈদের আগে টিউশনির সব টাকা অন্য কাজে খরচ করেছি এবং এই দুই জনের টাকা দিয়ে নিজের ঈদের জামাকাপড় কিনার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু হায়! ঈদের আগে টাকা দিল না, সম্ভবত ঈদের দিন টাকা দিল। ২০০ টাকা দিল।একজন শিক্ষার্থী শিশু শ্রেণির, তাই তার টাকা দেয়নি। নতুন জামা কিনতে না পারায় ঈদের নামাজ পড়িনি, ঘরে শুয়ে কান্নাকাটি করেছি।তখন তো ঈদের জামাকাপড়ে ঈদ সীমাবদ্ধ থাকতো।আস্তে-ধীরে টিউশনি বাড়তে লাগলো। বাবা এবং চাচার( জসিম উদ্দীন) সহযোগিতার পাশাপাশি টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের চাহিদা মেটাতে শুরু করলাম। ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে থাকাকালীন সময়ে এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এসে আমাকে বললেন, ভাতিজা, আমার মেয়েটাকে পড়াও, মাস শেষে খুশি করে দিব।মেম্বারের মেয়ে পড়াব, আমি ত আনন্দে আটখানা হয়ে গেলাম। উনার শিশু শ্রেণির মেয়েকে দেড় মাস পড়ানোর পর টাকা না পেয়ে চেয়ে বসলাম এবং মেম্বার সাহেবের স্ত্রী আরেকজনের মাধ্যমে ১৫০ টাকা দিল।আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।অন্যদের বেতন ৪০০ টাকা, যেহেতু মেম্বার তাই ৫০০ টাকা আশা করেছিলাম। আমি ফিতরার টাকা নেই না, এরকম কথা বলে টাকা ফিরিয়ে দিলে মেম্বারের স্ত্রী এসে বলে, বাবা, তুই আই দেহি যা, হিতরার টেঁয়া আলাদা রাখছি। যাহোক, কিছুদিন পর ৫০ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে আবার টাকা পাঠালো এবং অভাবের তাড়নায় আমিও নিলাম। তবে গ্রামে যারা দিন আনে দিন খায় তারাই কষ্ট করে টিউশনির টাকা দেয়, স্যালুট জানাই। আর যারা তুলনামূলক স্বচ্ছল তারা অভাব দেখায় এবং বেতন কম দিতে চায়। ঘরে সবকিছু দামী, অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো বাজেট নেই।দুঃখজনক!!

টিউশনি করতে গিয়ে একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। যাদেরকে সর্বাত্মক দেওয়ার চেষ্টা করেছি কিংবা বেতন সেক্রিফাইস করেছি তারা আমাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেনি।একজনের কাছে কম টাকা রাখলে সে অন্যের কাছে বলে দিত এবং আমি ক্ষতিগ্রস্ত হতাম।তাছাড়া অনেকে স্কুলে থাকতে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করত এবং ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার পর আমাকে এখন ‘ভাই’ বলে। ‘স্যার’ ডাকলে তারা লজ্জিত হয়। তবে এরা নিজ বাবার থেকে উন্নত পর্যায়ে গেলে বাবাকেও কদর করবে না, আমার তাই মনে হয়। তাছাড়া সেদিন এক শিক্ষক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছিলেন, যে ছাত্র শিক্ষকদের পরিচয় অস্বীকার করে সে একদিন পিতৃ পরিচয়ও অস্বীকার করবে(আলামিন সবুজ স্যার থেকে শুনেছি) । তবে এখন শিক্ষার্থীদের সাথে সুষম পরিমাণে মিশি।অতিরিক্ত কোনো কিছুই ত ভালো না।যে যাই বলুক, সবসময় তাই বলুক। ‘ভাই’ বললে আপত্তি নেই, যদি তা প্রথম থেকে বলে।

টিউশনির সুবাদে সম্মান পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। অনার্স সেকেন্ড / থার্ড ইয়ারে থাকাকালীন সময়ে ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ এবং গাজিপুর ফাজিল মাদ্রাসায় ফিজিক্সের গেস্ট টিচার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছি।কৃতজ্ঞতা অধ্যাপক কে এম মেছবাহ উদ্দিন স্যার ও মাসুদ স্যারের প্রতি। আরও বিভিন্ন জায়গায় অফার পেয়েছি, যা আমার জন্য পরম প্রাপ্তি। তবে একটা কোচিং সেন্টারে জয়েন করে ভাবমূর্তি নষ্ট করেছি, যা আমার আজীবন মনে থাকবে। তাছাড়া ছাত্রাবস্থায় টিউশনির পাশাপাশি আমার তিনটি বই ( তুমি অপরা, প্রেমবিদ্যা এবং চমৎকার পদার্থবিজ্ঞান) প্রকাশ হয়েছে।ত্রিশের মতো গান লিখলেও একটি গান( আমার একটা তুমি ছিলো) রিলিজ হয়েছে এবং প্রসংশিত হয়েছে।

ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার হলো আমি সবসময় টিউশনির নাস্তা খুব উপভোগ করি। একদিন এক বাসায় নাস্তা দেওয়ার পর বললাম, আমি এগুলো পছন্দ করি না। তারপর বলতে গেলে নাস্তা দেওয়ায়ই বন্ধ হয়ে গেল। এখন আর লজ্জা পাই না, যখন যা দেয় তাই খাই।আর মাস শেষে আকারে ইঙ্গিতে বেতনের কথা স্মরণ করিয়ে দেই। তবে একটা বলতে পারি যে, বেতনের জন্য অন্তত কোনো গরীব শিক্ষার্থীর প্রাইভেট পড়া মিস হয় না।

মাঝেমধ্যে আমি অনুতপ্ত হই এই জন্য যে, গ্রামে পরিশ্রমী শিক্ষার্থী কম পাই। অধিকাংশ স্কুল শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখে ফাইনাল পরীক্ষার হলে কে যাবে এবং আগে থেকেই তাঁর পূজা করে। ভালো শিক্ষকদের মাঝেও গ্রামে এমন কিছু শিক্ষক থাকে যারা অসদুপায় অবলম্বন করে পাস করার স্বপ্ন দেখায় এবং শিক্ষার্থীদেরকে জিম্মি করে নিজের কাছে প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করে। তাছাড়া স্কুল পরীক্ষার পূর্বে শর্ট সাজেশন দিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা সংকুচিত করে। তবে এসব শিক্ষার্থীরা ফিউচারে কর্মজীবনে গিয়ে হতাশা সাগরে নিমজ্জিত হয়ে ঐ শিক্ষকদের অসম্মান করলে তার জন্য ত শিক্ষকরাই দায়ী। আর আমার কাছে পড়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী ক্লাসে প্রেসারে ছিলো, আমি তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

বর্তমানে শিক্ষার্থীরা মেইন ওয়ার্ক নিয়ে কাজ করে কম। এটা হবে, সেটা হবে, ওটা হবে এবং আরো কতো কিছু যে হবে – কিন্তু পড়াশোনা নেই।গ্রামে তারা অমুক-তমুকের পিছনে ঘুরে ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিচ্ছে। নেতার(অশিক্ষিত) পিছনে ঘুরে অনেক স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে, যা নেতাও জানে না। তাছাড়া আড্ডা বেড়ে যাচ্ছে এবং আড্ডায় পড়াশোনা ছাড়া সবকিছু নিয়ে কথা হয়। কে কত দামের মোবাইল কিনবে, কে কার আগে মোটরসাইকেল কিনবে, কে কোন ভাইয়ের পিছনে ঘুরে এবং কে কোন দেশে কী করে- তাই হচ্ছে আড্ডার মূল আলোচনা। এমনকি আমার টিউশনির শিক্ষার্থীরাও এসব অকাজে আকৃষ্ট হয়, কিন্তু এখন আমি আর জোরেশোরে বাধা দেই না। তবে চাই শিক্ষার্থীরা যেন যথাসময়ে মেইন ওয়ার্ক করে এবং ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা/আলোচনা করে।

যাইহোক, কথা বাড়াতে চাই না। আমি এখন ফিজিক্সে মাস্টার্স করি। বন্ধুবান্ধবে অতিরিক্ত বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করি, বন্ধুর অপর নাম বন্ধুক এবং মাঝেমধ্যে বলি-

এই জগতে কেউ কারো নয়,
যা দেখি- তা তো অভিনয়।

হ্যাঁ, এটিই সত্যি। তাই টাইম পাস করি শিক্ষার্থীদের সাথে। টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করি। রাতে প্রস্তুতি নেই এবং নিজের স্টাডি ঠিক রাখি।নিজেকে কাজে নিমজ্জিত করি।যার কাজ নেই, তার লাজ নেই। কাজ না থাকলে কাজ সৃষ্টি করার চেষ্টা করি। মানুষ কাজে ব্যস্ত থাকলে অন্যের সমালোচনা করার টাইম পায় না, বরং সমালোচিত হয়।তবে একটা কথা বলতে পারি যে, টিউশনি আমার চলার পথের চালিকাশক্তি। আমি যখন টিউশনি করি, অন্য বন্ধুরা তখন অ্যাকাডেমিক বই কিংবা চাকরির বই পড়ে। আর এসব নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকলে আমাকে পড়াশোনাই ছাড়তে হবে। তাই দুটোই চালিয়ে নিচ্ছি।আল্লাহ ভরসা।

একটা কথা বলতে ভুলেই গেলাম। আজ সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখেই টিউশনি লাইফের ১৩ বছর পূর্ণ হলো। সব শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা, কারো প্রতি দুঃখ/ বদদোয়া নেই।অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সময়ের স্বল্পতা এবং নিজের অজ্ঞাতার কারণে লেখাটা তত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি, সরি।শিক্ষক হতে চাই, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখি এবং শিক্ষকতাই প্রফেশন হিসেবে আমার ফার্স্ট চয়েস।যে স্বপ্ন আমি হৃদয়ে ধারণ করি তা হলো –

ক্যাপশন: টিউশনির তেরো বছর পূর্ণ, বেতনের জন্যও কাঁদতে হয়েছে

রাসেল ইব্রাহীম
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ (মাস্টার্স)
চাঁদপুর সরকারী কলেজ, চাঁদপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *