সড়ক কাটার ঘটনায় ফরিদগঞ্জের দিগদাইর গ্রাম উত্তপ্ত

বিশেষ প্রতিনিধি:
ফরিদগঞ্জে ঈদের নামাজের স্থান ও গরীবদের মাঝে কোরবানীর মাংস বিতরনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা । ওই উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ কর্র্তৃক কলেজের এক প্রভাষক ও এক আওয়ামীলীগ নেতার উপর হামলা পর ক্ষিপ্ত হয়ে হামলাকারীদের বাড়ির প্রবেশ পথ কেটে দিয়ে বেড়া দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার ৩ নং সুবিদপুর পুর্ব ইউনিয়নের দিগদাইর গ্রামের পাটওয়ারী বাড়ী ও বেপারী বাড়ীতে ঈদের দিন শনিবার ও ঈদের পর দিন রোববার এ ঘটনা ঘটে। হামলার ঘটনায় ফরিদগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত মামলায় পুলিশ ১জনকে আটক করেছে। এদিকে এই ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
জানা গেছে, সুবিদপুর পুর্ব ইউনিয়নের দিগদাইর গ্রামে একটি ঈদগাহ রয়েছে। বেপারীর বাড়ির সামনে এই ঈদগাহ মাঠে এলাকার মুসুল্লীরা দীর্ঘদিন থেকেই ঈদের নামাজ আদায় করেন। সর্বশেষ করোনাকালিন সময়েও ঈদুল ফিতরের নামাজ এই ঈদগাহ মাঠে আদায় করা হয়। কিন্তু ঝামেলা বাঁধে ঈদুল আযহার নামাজ নিয়ে। করোনাকালে উন্মুক্তস্থানে তথা ঈদগাহে নামাজ পড়া নিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সাথে সাথে স্থানীয় লোকজনের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ না হয়ে স্থানীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও পূর্ব থেকে ওই এলাকায় গরীবদের জন্য কোরবানীর মাংস একসাথ করে তালিকা অনুযায়ী বিতরণ করা হয়। ওই তালিকা নিয়েও এবার বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই দুটি ঘটনা নিয়ে গ্রামের পাটওয়ারী ও বেপারীর বাড়ির কিছু লোকজনের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। ঈদের দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় দিগদাইর বাজারে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে গল্লাক আদর্শ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক শরীফ পাটওয়ারী ও আওয়ামীলীগ নেতা মফিজ মুজমদারের উপর হামলা ঘটনা ঘটে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে পাটওয়ারীর বাড়ির লোকজন। তারা এই হামলার ঘটনার জন্য বেপারী বাড়ির লোকজনকে দায়ী করে তাদের বাড়ির রাস্তায় বেড়া দেয়ার সাথে সাথে রাস্তা কেটে দেয় ঈদের দিন রাতে ও পরদিন। ফলে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী ৪টি বাড়ির লোকজন বস্তুত গৃহবন্দি হয়ে পড়ে।
বেপারী বাড়ির লোকজন জানান, রাস্তায় বেড়া দেয়ার সাথে সাথে তাদের কোন লোকজনকে পাটওয়ারী বাড়ির লোকজন রাস্তায় বের হতে দিচ্ছে না। সর্বসময় হামলার ভয়ে তারা আতংকিত। এই অবস্থান অবসান চান তারা। অন্যদিকে হামলায় কলেজ প্রভাষকসহ প্রবীণ এক আওয়ামীলীগ নেতা আহত হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ পাটওয়ারীর বাড়ির লোকজন জানান, কোন ঘটনার সাথে শরীফ পাটওয়ারী ও মফিজ মজুমদার জড়িত না থাকলেও তাদের উপর হামলা করে আহত করার ঘটনা মেনে নেয়ার মতো নয়। তারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করে করোনাকালে মসজিদের পরিবর্তে ঈদগাহে নামাজ আদায়ের মতো কাজ করেছে। তাছাড়া ওই বাড়ির লোকজন বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত এসব বিষয়ে তাদের বললে তারা বরং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এদিকে মফিজ মজুমদার ও শরীফ পাটওয়ারীর উপর হামলা ঘটনায় শরীফ পাটওয়ারী বাদী হয়ে ফরিদগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর সোমবার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রিপন নামে একজনকে আটক করে।
দিগদাইর ঈদগাহ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কালু পাটওয়ারী জানান, দীর্ঘ দিন থেকে আমাদের এলাকায় ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় হয়। সে মোতাবেক ঈদুল ফিতরের নামাজ ঈদগাহে আদায়ের পর ঈদুল আযহার নামাজ ঈদগাহ মাঠে আদায়ের জন্য ঈদের আগের দিন শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের সময় ঈদের দিন সকাল ৮টায় সময় নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে বর্তমান করোনা দূর্যোগের কারণে সরকারী ভাবে গণজামায়েত নিষিদ্ধ হওয়ায় স্বল্প পরিষরে মসজিদে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। কিন্তু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অতি উৎসাহী কিছু লোকজন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়াও পূর্ব থেকে আমাদের এলাকায় গরীবদের জন্য কোরবানীর মাংস একসাথ করে তালিকা অনুযায়ী বিতরণ করা হয়। ওই তালিকা নিয়েও বিতর্ক আসে। একে কেন্দ্র করেই ক্ষমতা ও এলাকার আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে দ্বন্দের সৃষ্টি হয় এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে গল্লাক আদর্শ ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক মোঃ শরীফ হোসেন পাটওয়ারী আহত হয়। সেই কারণে একটি বাড়ীর রাস্তা কেটে দেওয়া ও বেড়া দেওয়া এটি অত্যান্ত দুঃখ জনক ঘটনা। এতে এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। আমরা চেষ্টা করছি তা দ্রুত মিমাংসার জন্য।
ওই বাড়ির ও এলাকার মামুন ,সেকান্তর বেপারী, আঃ মুনাফ বেপারীসহ অনেকেই জানান, একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাটওয়ারী বাড়ীর লোকজন নিজেদের আধিপত্ব জাহির করার জন্য এই নেক্কার জনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। আমরা ৪ টি বাড়ীর মানুষ গৃহবন্দী হয়ে পড়েছি। এই ঈদের সময়ে আমাদের কোন অতিথি আসলেও তারা বিভিন্ন উস্কানী মূলক কথা বলে তাদেরকে রাস্তা থেকে বিদায় করে দেয়। ছোট ছোট ছেলেদের সাথে ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানী করে আসছে। আমাদের বাড়ীর শত বছরের পুরনো রাস্তা কেটে দিয়ে ও বেড়া দিয়ে যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে তা ভবিষ্যতের জন্য অশুভ দিক বয়ে আনবে। আমরা এ ঘটনা সুষ্ঠ বিচার দাবী করি।
ঘটনা নিয়ে প্রভাষক শরীফ পাটওয়ারী জানান, ফরিদপুরে সড়ক দূর্ঘটনায় আমার শ্যালক নিহত হয়। আমি তাদের দাফন সেরে ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় বাড়ি আসি। এরপর অন্যান্য দিনের মতো দিগদাইর বাাজারের মনিরের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময় অতর্কিতে আওয়ামীলীগ নেতা মফিজ মজুমদারের উপর একদল লোক হামলা করে। আমি তাদের রোধ করতে চাইলে তারা ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায়ে আমার কারণে করতে পারেনি বলে হুংকার দিয়ে আমার উপর হামলা করে। পরে স্থানীয় লোকজন আমাদের উদ্ধার করে হাজীগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। তিনি জানান, বেপারীর বাড়ির লোকজন আমাদের উপর হামলা করায় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় বেড়া দিয়েছে এবং কেটে দিয়েছে। তিনি দাবী করেন ওই সড়কটি পাটওয়ারীর বাড়ির।
শরীফ পাটওয়ারীর দায়ের করা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ব্যবসায়ী শেখ ফরিদ জানান, ঘটনার সময় আমি ওই এলাকাতেই ছিলাম না। পুলিশ ঘটনার সঠিক তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তবে শরীফ পাটওয়ারীর উপর হামলা ঘটনাটি যেমন দু:খজনক। তেমনি এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সড়কে বেড়া দেয়া সড়ক কেটে দেয়াও দু:খজনক। আমি ঘটনা জানার পরে বহু লোকের মধ্যে দিয়ে বসে সমাধানের চেষ্ঠা করেছি। কিন্তু তারা রাজি হয়নি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাওঃ শরাফত উল্যা জানান, প্রভাষক শরীফ পাটওয়ারীর উপর হামলা ঘটনাটি দু:খজনক। তবে রাস্তায় বেড়া দেয়া ও কেটে ফেলার ঘটনাটি কেউই আমাকে জানায় নি।
ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রকিব জানান, ঘটনা শুনে আমি থানা পুলিশের একটি ফোর্স সেখানে পাঠাই। প্রভাষক শরীফ পাটওয়ারীসহ অন্যদের উপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। একজনকে আটক করা হয়।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় লোকজন জানান, দুই বাড়ির লোকজনের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকেই স্থানীয় রাজনীতির সাথে সাথে পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতাও জড়িত। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনার দুইদিন পরও দুই পক্ষের মধ্যেই থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। দ্রুত এর সুষ্ঠু সমাধান না হলে আবারো হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা আশংকা ব্যক্ত করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *